সন্তান প্রসব বা ডেলিভারি পৃথিবীতে কষ্টকর ব্যথাগুলোর একটি।এই ব্যথা সহ্য করতে না পেরে বর্তমান আধুনিক যুগেও মৃত্যুর ঘটনা অহরহ। সুতরাং প্রসবকালীন জরুরি অবস্থায় মহিলা ডাক্তার কিংবা অভিজ্ঞ নার্স পাওয়া না গেলে পুরুষ ডাক্তারের সাহায্য নেওয়া জায়েজ।

তবে এক্ষেত্রে পুরুষ ডাক্তারের জন্য নারীর চিকিৎসার যে সকল নীতিমালা রয়েছে এসকল নীতিমালার প্রতি পূর্ণমত্রায় খেয়াল রাখতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَ لَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡکُمۡ اِلَی التَّهۡلُکَۃِ ۚۖۛ وَ اَحۡسِنُوۡا ۚۛ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না। আর সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করো; যারা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করে আল্লাহ তাদেরকেই ভালোবাসেন। (সুরা বাকারা: ১৯৫)
তবে, যতক্ষণ পর্যন্ত মহিলা ডাক্তার কিংবা অভিজ্ঞ নার্সের মাধ্যমে সন্তান ডেলিভারি করার সুযোগ থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া জায়েজ নয়। অর্থাৎ মহিলা রোগীর চিকিৎসা মহিলা ডাক্তারকেই করতে হবে। তবে রোগের বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার পাওয়া না গেলে প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারও চিকিৎসা করতে পারবে। সেখানে মহিলার কোনো অভিভাবক তার সঙ্গে থাকবে। (আল বাহরুর রায়েক: ৮/১৯২)

জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পুরুষ ডাক্তারের সাহায্য নিলেও কিছু নীতিমালা খেয়াল রাখতে হবে।

ক) যথাসম্ভব পর্দা রক্ষা করতে হবে। শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনে যতটুকু দেখা বা স্পর্শ করা প্রয়োজন শুধু ততটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। চিকিৎসা করা বা শিক্ষার প্রয়োজনে কারো সতর-লজ্জাস্থান খোলার প্রয়োজন হলে শুধু প্রয়োজন পরিমাণ খোলার অনুমতি আছে, এর বেশি অনুমতি নেই। এ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের জন্য জরুরি হলো যথাসম্ভব তার দৃষ্টিকে প্রয়োজন পরিমাণ সীমাবদ্ধ রাখবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/১২৪)
খ) মহিলা রোগীর সাথে নির্জনে এক কক্ষে অবস্থান করবে না। কেননা রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, مَن كان يؤمنُ باللهِ واليومِ الآخرِ فلا يخلوَنَّ بامرأةٍ ليسَ معها ذو مَحرَمٍ منها ، فإنَّ ثالثَهما الشَّيطانُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন কোনো পরনারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে যতক্ষণ তাদের মাঝে কোনো মাহরাম পুরুষ না থাকে। অন্যথায় তাদের মাঝে তৃতীয় জন হবে শয়তান। (মুসনাদে আহমদ: ১৬৬৫১)

এই মূলনীতির বিষয়ে ইসলামি ফিকহ একাডেমি থেকে এক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে-
الأصل أنه إذا توافرت طبيبة متخصصة يجب أن تقوم بالكشف على المريضة ، وإذا لم يتوافر ذلك فتقوم بذلك طبيبة غير مسلمة ثقة ، فإن لم يتوافر ذلك يقوم به طبيب مسلم ، وإن لم يتوافر طبيب مسلم يمكن أن يقوم مقامه طبيب غير مسلم ، على أن يطّلع من جسم المرأة على قدر الحاجة في تشخيص المرض ومداواته وألا يزيد عن ذلك وأن يغض الطرف قدر استطاعته ، وأن تتم معالجة الطبيب للمرأة هذه بحضور محرم أو زوج أو امرأة ثقة خشية الخلوة

অর্থাৎ ‘শরিয়তের মূল বিধান হচ্ছে- বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেকআপ করবেন। যদি মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া যায় তাহলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি অমুসলিম মহিলা ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার সে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শর্ত হলো- পুরুষ ডাক্তার রোগীর শরীরের ততটুকু দেখবেন যতটুকু দেখা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার স্বার্থে প্রয়োজন; এর বেশি দেখবে না এবং সাধ্যমত দৃষ্টি অবনত রাখবে। পুরুষ ডাক্তারকে চিকিৎসা করতে হবে রোগীর মাহরাম কিংবা স্বামী কিংবা কোনো বিশ্বস্ত নারীর উপস্থিতিতে; যাতে করে নিষিদ্ধ নির্জনবাস না ঘটে। (একাডেমির জার্নাল থেকে সংকলিত: ৮/১/৪৯)

মুফতী লোকমান হুসাইন

২৯/০১/২০২৫ঈ