সাহায্যকারী ভূমিতে জি-হা"দের কাজ করলে কি কি-তা*লের ফযীলত পাওয়া যাবে?
প্রশ্নঃ
আমরা জানি, জি-হা"দের ময়দান দুই ধরনের হয়ে থাকে । একটি হচ্ছে, সম্মুখ যু*দ্ধের ময়দান। আরেকটি হচ্ছে, সাহায্যকারী ময়দান । বর্তমানে আলহামদুলিল্লাহ উভয় ময়দানেই জি-হা"দের কাজ হচ্ছে।
আমরা এও জানি যে, জি-হা"দ ও কি-তা*লের বিপুল ফযীলতের কথা অসংখ্য হাদীসে এসেছে। যেমন, আল্লাহর রাস্তায় এক সকাল কিংবা এক বিকাল পরিমাণ সময় দেওয়া, উটের দুধ দোহানো পরিমাণ কি-তা*ল করা, আল্লাহর রাস্তায় ধূলি-মলিন হওয়া ইত্যাদির বিরাট বিরাট ফযীলতের কথা বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে,
ক) আমরা যারা বাংলাদেশের মতো সাহায্যকারী ভূমিতে জি-হা"দ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ করছি, আমরা যদি এসব কাজে পূর্ণ ইখলাস ও ইহতিসাবের সাথে (একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে সাওয়াব প্রাপ্তির আশায়) এক সকাল কিংবা এক বিকাল পরিমাণ অথবা উটের দুধ দোহানো পরিমাণ সময় দেই তাহলে কি সম্মুখ যু*দ্ধের ময়দানে এক সকাল কিংবা এক বিকাল পরিমাণ অথবা উটের দুধ দোহানো পরিমাণ সময় দেয়ার সেই ফযীলত লাভ করতে পারবো?
একইভাবে আল্লাহর রাস্তায় ধূলি-মলিন হওয়ার যে ফযীলতের কথা হাদীসে এসেছে, আমরা যদি পূর্ণ ইখলাস ও ইহতিসাবের সাথে জি-হা"দী কোনো উদ্দেশ্যে কোথাও সফর করি তাহলে কি সেই ফযীলত আমরা লাভ করবো?
খ) যদি আমাদের এখানকার কাজের দ্বারা এই সব ফযীলত লাভ করা না যায় তাহলে আমার জন্য শাম কিংবা এ ধরনের কোনো ময়দানে গিয়ে সেই ফযীলত অর্জনের চেষ্টা করা দীনী দিক থেকে অধিক নিরাপদ হবে কি না? মেহেরবানি করে একটু বিস্তারিত জানালে অনেক উপকৃত হবো।
-আব্দুর রহীম
উত্তরঃ
بسم الله الرحمن الرحيم
আল্লাহর নিকট কোন আমল অধিক পছন্দনীয়, কোন আমলের সাওয়াব ও মর্যাদা বেশি, সে অন্বেষা প্রত্যেক মুসলিমের মধ্যে থাকা কাম্য। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই অন্বেষা দান করেছেন। আপনাকে আমাকে এবং সকল মুসলিমকে আল্লাহ তাআলা এই নেয়ামত পূর্ণাঙ্গরূপে দান করুন এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন।
সাওয়াবের পরিমাণ ‘তাওকীফী’ বিষয়
কোনো আমলের সুনির্দিষ্ট সাওয়াব ও ফযীলতের বিষয়টি ‘তাওকীফী’ তথা শরীয়তের পক্ষ থেকে বর্ণনা নির্ভর বিষয়। কিয়াস ও যুক্তি দিয়ে তার বর্ণনা দেওয়া যায় না।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ (৭২৮ হি.) বলেন,
فالحاصل: أن هذا الباب يروى ويعمل به في الترغيب والترهيب لا في الاستحباب ثم اعتقاد موجبه وهو مقادير الثواب والعقاب يتوقف على الدليل الشرعي. -مجموع الفتاوى (18/ 68)
“… সাওয়াব ও আযাবের পরিমাণের বিষয়টি শরীয়তের দলীলের ওপর মওকুফ-নির্ভরশীল।” –মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৮/৬৮
আব্দুল আযীয বিন আহমাদ আল-বুখারী রহিমাহুল্লাহ (৭৩০ হি.) বলেন,
الثواب والعقاب لا يعرفان إلا بورود السمع وليس في العقل إمكان الوقوف عليهما. اه -كشف الأسرار شرح أصول البزدوي (4/ 230(
“সাওয়াব ও আযাব শরীয়তের বর্ণনা ব্যতীত জানা যায় না, যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে তা নির্ণয় করার সুযোগ নেই।” –কাশফুল আসরার, শরহু উসূলিল বাযদাবী: ৪/২৩০
সব আমলের ফযীলত কুরআন সুন্নাহ’য় বর্ণিত হয়নি
সব আমলের সুনির্দিষ্ট ফযীলত ও সাওয়াব কুরআন সুন্নাহ’য় বর্ণিত হয়নি। বিশেষ কোনো কারণে বিশেষ কিছু আমলের সুনির্দিষ্ট ফযীলত ও সাওয়াবের কথা কুরআন সুন্নাহ’য় বর্ণিত হয়েছে। কোনো আমলের বিশেষ ফযীলত বর্ণিত হওয়া স্বাভাবিকভাবেই উক্ত আমলের বিশেষত্ব নির্দেশ করে, কিন্তু এর অর্থ আদৌ এটা নয় যে, যে আমলের ফযীলত বর্ণিত হয়নি, তার সাওয়াব ও মর্যাদা, যে আমলের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তার চেয়ে কমই হতে হবে। হতে পারে বিশেষ কোনো কারণে অন্য আমলের ফযীলত ও মর্যাদা এর চেয়েও বেশি হবে।
সাওয়াব বৃদ্ধির কারণ অনেক
একটি আমলের সাওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধির বিভিন্ন কারণ রয়েছে। আমলটি কতটুকু প্রয়োজনীয়, কতটুকু উপকারী, কতটুকু কষ্টসাধ্য, কতটুকু ইখলাস ও ইহতিসাবের সঙ্গে করা হচ্ছে, আনুগত্যের কতটুকু অনুকূল হয়েছে, এমন নানান কারণে আমলের সাওয়াব ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ (৭২৮ হি) বলেন,
ومما ينبغي أن يعرف أن الله ليس رضاه أو محبته في مجرد عذاب النفس وحملها على المشاق حتى يكون العمل كلما كان أشق كان أفضل كما يحسب كثير من الجهال أن الأجر على قدر المشقة في كل شيء لا ولكن الأجر على قدر منفعة العمل ومصلحته وفائدته، وعلى قدر طاعة أمر الله ورسوله. فأي العملين كان أحسن وصاحبه أطوع وأتبع كان أفضل. فإن الأعمال لا تتفاضل بالكثرة. وإنما تتفاضل بما يحصل في القلوب حال العمل. -مجموع الفتاوى (25/ 281-282(
“জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভ শুধুই নফসকে শাস্তি দেওয়া আর যাবতীয় কষ্টসাধ্য কাজে বাধ্য করার মধ্যে নিহিত নয়। এমন নয় যে, সর্বদাই আমল যত কঠিন হবে তার ফযীলতও তত বেশি হবে। যেমনটা অনেক নির্বোধ মনে করে যে, সকল ক্ষেত্রেই কষ্ট অনুপাতে সাওয়াব নির্ধারিত হয়। না, বিষয়টা এমন নয়। বরং কাজের বিনিময় ও প্রতিদান নির্ধারিত হয় তার উপকারিতা, কল্যাণ ও ফায়েদার দিকে লক্ষ করে এবং কাজটা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে কতটা উত্তীর্ণ সে বিবেচনায়। সুতরাং প্রত্যেক দুটি আমলের মধ্যে যেটা অধিক সুন্দর এবং যার কর্তা অনুসরণ অনুকরণে বেশি অগ্রগামী, সেটাই শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে। কেননা দীনী কাজসমূহে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি সংখ্যাধিক্য নয়; বরং কাজের সময় অন্তরের অবস্থা কেমন ছিলো, সেটাই মুখ্য বিষয়।” –মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৫/২৮১-২৮২
তিনি অন্যত্র বলেন,
قول بعض الناس: الثواب على قدر المشقة ليس بمستقيم على الإطلاق … وأما الأجر على قدر الطاعة فقد تكون الطاعة لله ورسوله في عمل ميسر كما يسر الله على أهل الإسلام ” الكلمتين ” وهما أفضل الأعمال؛ ولذلك قال النبي صلى الله عليه وسلم {كلمتان خفيفتان على اللسان ثقيلتان في الميزان حبيبتان إلى الرحمن سبحان الله وبحمده سبحان الله العظيم} أخرجاه في الصحيحين. ولو قيل: الأجر على قدر منفعة العمل وفائدته لكان صحيحا. –مجموع الفتاوى: 10\620-621
“অনেকে যে বলেন, ‘আমলের সাওয়াব এর কষ্ট অনুপাতে মিলবে’, একথাটি সর্বক্ষেত্রে পুরোপুরি সঠিক নয়। … বরং সাওয়াব হবে আনুগত্যের পরিমাণ অনুযায়ী। কখনও অনেক সহজ আমলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের জন্য দুটি কালিমা সহজ করে দিয়েছেন। অথচ এ কালিমাদ্বয় শ্রেষ্ঠ আমল। এজন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দুটি কালিমা আছে, যা যবানে অনেক হালকা, কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় অনেক ভারি এবং দয়াময়ের কাছে অনেক প্রিয়। (কালিমা দুটি হচ্ছে-) سبحان الله وبحمده سبحان الله العظيم (আমরা আল্লাহর প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করছি, মহান আল্লাহ যাবতীয় ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে পবিত্র)’। (সুতরাং তা না বলে) যদি বলা হতো, সাওয়াব দেয়া হবে আমলের উপকারিতা ও ফায়দা অনুপাতে, তাহলে কথাটি সঠিক হতো।” -মাজমুউল ফাতাওয়া: ১০/৬২০-৬২১
সাওয়াব বৃদ্ধির একটি কেন্দ্রীয় মূলনীতি
সাওয়াব বৃদ্ধির একটি ‘আসলুল উসূল’ তথা কেন্দ্রীয় মূলনীতি হল, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
{مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ } [البقرة: 261[
“যারা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত এ রকম, যেমন একটি শস্য দানা সাতটি শীষ উদগত করে এবং প্রতিটি শীষে একশত দানা জন্মায়। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন, বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময় এবং সর্বজ্ঞ।” –সূরা বাকারা ০২:২৬১
অর্থাৎ আল্লাহ যাকে খুশি, তাকে বাড়িয়ে দেন এবং যত খুশি তত বাড়িয়ে দেন। এর কোনও সীমা পরিসীমা নেই।
একারণেই হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ. -صحيح البخاري: 3673
“হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালমন্দ করো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পরিমাণ সোনাও (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে, তাঁদের এক মুদ কি আধা মুদের সমানেও পৌঁছতে পারবে না।” -সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩৬৭৩
উল্লেখ্য, মুদ হচ্ছে এক কেজির কাছাকাছি একটি পরিমাপ।
শুধু পরিমাণ নয়, সাওয়াবের মানেও ব্যবধান আছে
আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, মান ও পরিমাণের ব্যবধান। অন্য সবকিছুর মতো বান্দার আমলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য। একারণেই যে ব্যক্তি হাজার মাসের চেয়ে উত্তম শবে কদরের মতো ফযীলতপূর্ণ রাতে শুধু ইশা ও ফজরের ফরয আদায় করে বাকি রাত ঘুমিয়ে কাটায়, তার আমল ওই ব্যক্তির এমন হাজার রাতের আমল অপেক্ষা উত্তম, যে ইশা ও ফজর বাদ দিয়ে এই রাতগুলো বিনিদ্র নফল ইবাদতে যাপন করে।
একারণে হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় আমল ফরযসমূহ। অর্থাৎ যখন যে পরিস্থিতিতে যে আমল বান্দার উপর ফরয, তা আল্লাহর নিকট অন্য সকল আমল থেকে অধিক পছন্দনীয় এবং বান্দার জন্